আজকে যখন পুকুর-মাঠ ভরিয়ে ঝাঁ-চকচকে বাড়ি, ফ্ল্যাট, অথবা পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে ফ্ল্যাট বানানো `প্রগতি'র সমার্থক হয়ে গেছে আমাদের ছোট মফস্বল শহরে, তখন ভীষণ করে ফেলে আসা সময়, আর কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে তখনকার কথা যখন আমার বয়স তিন-চার-পাঁচ বছর। আমাদের পাড়া বলতে বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর চাষের জমির মধ্যে গোটা পাঁচ-সাত বাড়ি। এর মধ্যে দুটো বাড়ি আমাদের বাবা-জ্যাঠাদের। জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিণের দেওয়াল টপকালেই বিস্তীর্ণ কলা-বাগান, আর পুকুর। জ্যেঠার বাড়িতে ঢোকার দরজাও ছিল দক্ষিণ মুখো, মাটি থেকে একটু উঁচুতে। গোটা তিনেক সিঁড়ি চড়ে উঠতে হত। সব থেকে ওপরের সিঁড়িতে দাঁড়ালে আমরা ছোটরাও দেখতে পেতাম হাওড়া-বর্ধমান লাইন-এ ট্রেন-এর আনা-গোনা। বাড়ির দক্ষিণ-মুখো সদর দরজা আর দক্ষিণের পাঁচিলের মাঝখানে ছিল মস্ত কুঁয়ো, সেই কুঁয়ো যার মধ্যে আমার মেজ দাদা পড়ে গেছিলেন খুব ছোটবেলায়, এবং তারপরেও দাদার এবং আমার জ্যেঠিমার (আমাদের সকালের মণি) অকল্পনীয় সাহসে বেরিয়ে এসেছিলেন সেখান থেকে। সে আরেক দিনের গল্প। আজকের গল্প তাদের নিয়ে যারা আমার জ্যেঠার জমির দক্ষিণ-পূব কোণটাতে থাকত পাতায় ছাওয়া এক টিনে ঘেরা চালায়। আজ ঠিক সেই জায়গায় আমার বড়দার বিরাট দুতলা বাড়ি। সেদিন সেখানে দাঁড়ালে পূবে চোখে পড়ত আমাদের রাস্তা `সতীশ চক্রবর্তী লেন' পেরিয়ে আরেক বিস্তীর্ণ বাগান এবং চাষের জমি। সত্তরের দশকে ওসব জায়গায় নাকি নিত্য-ই রাজনৈতিক খুন-খারাবি লেগে থাকত। ছিল শেয়াল, আর যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য ভূতের উপদ্রব। দক্ষিণে সেই কলা-বাগান আর পুকুর। উত্তর আর পশ্চিমে আমাদের এবং আর দু-চারটে বাড়ি।
ওই টিন ঘেরা চালায় থাকত জগন্নাথ আর তার বউ। মহিলার পরিচয়-ই ছিল `জগন্নাথের বউ' বলে। তবে আমার মা-বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন `জগন্নাথের বউ' না বলে ওকে শুধু `বউ' বলে ডাকতে। কেন জানি না। একটু বড় হলে শুনেছি জগন্নাথের বউ নাকি আসলে ওর ভাইয়ের বউ। তা এ ঘটনা আমাদের সমাজে খুব অবাক করার মতো কিছু নয়। জগন্নাথ-রা অবশ্য ছিল সাঁত্ততাল। কালো কুচকুচে কিন্তু উজ্ব্বল গায়ের রং। যেন ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে খোদাই করে তৈরী নিখুঁত শরীর। যদিও জগন্নাথের বা ওর বৌয়ের বয়স খুব কম ছিলো না, যতটুকু মনে পড়ে। জগন্নাথ আর ওর বউ আমাদের রোজকার জীবনের অংশীদার ছিল। আমরা নিশ্চিন্তে খেলতাম জগন্নাথের ঘরের সামনে। ওদের ঘরের ভেতরেও যেতাম বিনা দ্বিধায়। আমাদের যাবতীয় টুক-টাক কাজে জগন্নাথ আর ওর বউ আমাদের সব সময় সাহায্য করত। কখন, কি ভাবে জগন্নাথ আর ওর বউ আমার জ্যেঠার বাড়ির এক কোণে যে ঠাঁই নিয়েছিল সে কথা আর আমার কোনদিন জানা হয় নি। আসলে ওই বয়সে এই প্রশ্ন-টা কোনদিন আমাদের মনে উঁকি-ই দেয় নি। জগন্নাথ আর ওর বউ ছিল আমাদের জীবনের-ই অঙ্গ। আমাদের থেকে একটু আলাদা, গায়ের রঙ্গে, আদব কায়দায়, বোদহয় খাদ্যাভ্যাসেও, ব্যাস এই পর্যন্ত। শুনেছি ওরা নাকি সাপ, ইঁদুর এসব খেত। সাপ খেতে কখনো দেখিনি। তবে একবার, খুব ছোটবেলায়, জগন্নাথকে একটা বড় ধেরে ইঁদুর মেরে নিয়ে যেতে দেখেছিলাম। ওরা কি ওটা খেয়েছিল? সাঁত্ততালরা কি ইঁদুর খায়? আমার জানা নেই। কিন্তু ওই যে বললাম, এগুলো আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক ছিল না। আমাদের থেকে একটু আলাদা হওয়া সত্বেও জগন্নাথ-রা আমাদের জীবনের-ই অঙ্গ ছিল।
মনে আছে আরো ছোটবেলার কথা। আমাদের নিজেদের বাড়ি তখন তৈরী হয় নি। আমরা জ্যেঠার বাড়ির কাছেই একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। সেখান থেকে উঠে যাচ্ছি আরেকটা ভাড়া বাড়িতে। জিনিস-পত্র নিয়ে যাওয়া একটা বড় কাজ। ডাক পড়ল জগন্নাথ আর জগন্নাথের বৌয়ের। মা ঝুড়ি ভরে ভরে জিনিস দিচ্ছেন, আর ওরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, যা কিনা মিনিট দশেকের হাঁটা পথ, নিয়ে যাচ্ছে মাথায় করে। একবার জগন্নাথের বউ এসেছে| আমাদের ঘরে দু ঝুড়ি জিনিস সাজানো। তার একটা জগন্নাথের বউ মাথা তুলেছে। মা বারণ করছেন আরেকটা নিও না, আর বউ জোরাজুরি করছে, আরেকটা দাও না, আমি ঠিক হাতে নিয়ে নেব। দ্বিতীয়টা নেওয়ার সময় যা হবার, মাথার ঝুড়িটা পড়ে গেল, আর তার মধ্যে রাখা মায়ের সাধের কৃষ্ণনগরের কিছু মাটির পুতুল ভেঙ্গে খান-খান। মাকে দীর্ঘ দিন এই নিয়ে আক্ষেপ করতে শুনেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো তিক্ততা ছিল না জগন্নাথ বা ওর বউ সম্বন্ধে। ওরা আগের মতই আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়েই রইলো। তখন আমাদের জীবনে অনুসঙ্গের চেয়ে মানুষ এবং তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কগুলো অনেক বেশি প্রাথমিক ছিল।
জগন্নাথ আর ওর বৌয়ের যে শেষে কি হলো আমার আজ আর মনে নেই। ওরা ওখানে মারা গেছিল বলে আমার মনে পড়ে না। হয়ত তার আগেই ওরা অন্য জায়গায় চলে গেছিল। হয়ত যে সময় থেকে আমাদের পাড়াটা সরল গ্রামীনতা কাটিয়ে কুত্সিত আধা-শহুরে `প্রগতি'র হাত ধরেছিল, সে সময়েই ওরা বুঝে গেছিল ওদের ওখানে থাকার দিন শেষ। নিজেদের এলাকা ছেড়ে এসেও যে সহজ, স্বাভাবিক, সরল জীবন ওরা বাঁচতে পেরেছিল তা আর সম্ভব হবে না। তাই একদিন ওরা হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে। আজকে আমাদের ছোট মফস্বল শহরের ফ্ল্যাট-সংস্কৃতিতে জগন্নাথদের জন্য কোনো কোণ আর পড়ে নেই।
No comments:
Post a Comment