Saturday, January 16, 2016

হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা ২

আরো কিছু মানুষের কথা মনে পড়ছে যারা হারিয়ে গেছে।  হারিয়ে গেছে শুধু আমাদের মফস্বল শহর থেকে নয়, হারিয়ে গেছে মধ্য-বিত্ত বাঙালির সমষ্টিগত চেতনা থেকে। হারিয়ে গেছে তার রোজকার জীবন থেকে।  হারিয়ে গেছে তার গান, গল্প, নাটক, সিনেমা থেকে।  

এক বৃদ্ধা মহিলা ছিলেন।  কাজে আসতেন আমাদের বাড়িতে।  কি কাজে আসতেন মনে পড়ে না।  বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা -- এসব নয়।  হয়ত আসতেন কয়লা ভাঙ্গতে, বা ওই জাতীয় কোনো কাজে।  তখন আমাদের এলাকায় LPG র ব্যবহার বলতে গেলে চালু হয় নি।  সবার ঘরেই কয়লার উনোন জ্বালিয়ে রান্না হত।  আমাদের প্রজন্মের যারা, তাদের নিশ্চই মনে আছে, পাড়ার কয়লার গোলা থেকে লোক এসে বস্তা থেকে কয়লা ঢেলে দিয়ে যেত।  কয়লার টুকরোগুলো হত বড় বড়।  উনোনে ব্যবহারের যোগ্য নয়।  সেগুলোকে ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরো করতে হত।  সে ছিল বেশ পরিশ্রমের কাজ।  বোধহয় সেই কাজেই আসতেন মহিলা।  বৃদ্ধা।  গায়ের চামড়ায় বয়সের রেখা।  কিন্তু শরীরে অসীম ক্ষমতা।  উনিও ছিলেন কোনো tribal. কি জানি না।  একবার অনেক দিন আসছেন না।  মা বললেন গিয়ে দেখে আসতে হবে কেন আসছে না।  শরীর খারাপ হলো কি না।  আর কাজে আসবে কিনা।  

আমিও চললাম মায়ের সাথে একদিন।  বেশি দূর নয়।  আমাদের বাড়ি থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ।  মা জানতেন কোথায় উনি থাকতেন।  তখন আমাদের ওই এলাকায় বাড়ি-ঘর হাতে গোনা।  ওই দশ মিনিটের পথে যে-কটা বাড়ি চোখে পড়ত তার প্রত্যেকটার বাসিন্দারাই আমাদের জানা।  একেবারে ব্যক্তিগত আলাপ না থাকলেও কোন বাড়িতে কে থাকে, এবং কি করে, এলাকার সকলেই প্রায় জানত।  খানিক দূর গিয়ে রাস্তার ওপরের বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে যে গালিটা গেছে সেটা দিয়ে একটু ঢুকে গেলেই বিরাট খোলা মাঠ।  তখন আমাদের এলাকায় এরকম মাঠ-পুকুর অসংখ্য।  পুকুর চুরি তখন শুরু হয় নি।  

এরকম একটা গলি দিয়ে ঢুকে মাঠের মধ্যে গিয়েই দেখি এক কোণে একটা ঘর।  মাটি থেকে একটু উঁচুতে বানানো একটা বাঁশের মাচা।  সেটাকে ঘিরে পাতায় ঘেরা, পাতায় ঢাকা, বোধহয় খেজুরের-ই পাতা হবে, অনেক খেজুর গাছ এদিক-ওদিক সে সময়ে, একটা ঘর।  একটা মানুষ তার মধ্যে শুতে-বসতে পারে কোনো রকমে, এরকম মাপের একটা ঘর।  মা আমাকে নিয়ে গেলেন সেটার কাছে।  দেখি তার মধ্যে শুয়ে বিড়ি খাচ্ছেন সেই মহিলা।  বলা বাহুল্য, আমাদের মতো মধ্য-বিত্ত বাঙালি ঘরের মহিলাদের মধ্যে ধূমপান আজকের মতো সে সময়েও প্রায় বিরল ছিল।  ছিল না বলাই ভালো।  কিন্তু আমরা ওই ধরণের মহিলাদের ধূমপান করতে দেখেছি, দেখতাম প্রায়শই।  আমরা জানতাম এরা হুবহু আমাদের মতো নয়।  কোথায় যেন একটু আলাদা।  কিন্তু এরা অপরিচিত ছিলেন না আমাদের কাছে।  একটু বিভেদ, একটু তফাত সত্ত্বেও এরা আমাদের রোজকার জীবনে উপস্থিত ছিলেন কোনো না কোনো ভাবে।  তাই ওনার বিড়ি খাওয়া আমাকে একটুও অবাক করে নি।  যেটা একটু ধাক্কা দিয়েছিল সেটা হলো এই যে উনি ঐটুকু মাত্র একটা পাতার ঘরের মধ্যে থাকেন। সে সময়ে আমাদের যে খুব আড়ম্বরের জীবন ছিল তা আদৌ নয়।  কিন্তু, তবু, কি করে যে একটা মানুষ ঐটুকু একটা ঘরের মধ্যে, একা, থাকে এটা আমাকে খুব একটু ঘা দিয়েছিল।  


যতদূর মনে পড়ে, উনি বলেছিলেন, খুব শরীর খারাপ।  পেটে পাথর হয়েছে। খুব সাধারণ দু-একটা কথা বার্তা বলে আমরা চলে এসেছিলাম। তারপর আর সেই মহিলা কখনো আমাদের বাড়িতে কাজে এসেছিলেন বলে মনে পড়ে না।  মারা গেছিলেন? অন্য কোথাও চলে গেছিলেন? জানি না কিছুই।  উনিও, ওনার মতো মানুষরাও হারিয়ে গেলেন আমাদের মফস্বল শহরের জীবন থেকে। যে সব মাঠের কোণে বাঁশের মাচার চারপাশে খেজুর পাতার ঘর বানিয়ে এরা থাকতেন সেই মাঠগুলো-ও চুরি হয়ে গেল আমাদের এলাকা থেকে, আমাদের জীবন থেকে। প্রান্তিক, মাটি থেকে উঠে আসা এই মানুষগুলো আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল কবে যেন।  হারিয়ে গেল আমাদের সমাজ থেকে, আমাদের সমষ্টিগত চেতনা থেকে। এখন এরা কোথায় থাকে? শহরের বস্তিগুলোতে? নাকি এরা ফিরে গেছে জঙ্গলের কাছে? এরা কি আর আগের মতো নিজেদের পরিচয় নিয়ে থাকতে পারে? নাকি সারা পৃথিবীর মতো এরাও `শহুরে’ হয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে?

No comments: