জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিনের পাঁচিল পেরোলেই কলা গাছের বাগান, মাঠ আর পুকুর। কখনো কখনো মাহুতকে পিঠে নিয়ে হাতি এসে পড়ত আমাদের পাড়ায়। ছোটদের মধ্যে হই-চৈ পড়ে যেত, `হাতি এসেছে, হাতি এসেছে।' দৌড় দিতাম রাস্তার দিকে। রাস্তা চলতে চলতে হাতিরা দু-একটা কলা গাছ উপড়ে নিত বাগান থেকে, যেটুকু ওদের শুঁড়ের নাগালের মধ্যে আসে তার থেকে। সেই হাতির, হাতির মাহুতরা আসে না আজ আর। আর আসবে কোথায়? আজ সেই বাগান নেই, মাঠ নেই, কলা গাছ-ও নেই। আজকে আমাদের রাস্তায় ঝাঁ চকচকে গাড়ি চলে, মোটর বাইক চলে। হাতি আর মাহুতদের সেখানে ঠাঁই নেই।
হাতির কথা যখন হচ্ছে, তখন আমার বর্তমান বাসস্থান ইলাহাবাদ নিয়েও দু-চার কথা বলা যাক। এখানেও কয়েকটা হাতি ছিল। ছিল বলছি, অনেক দিন ওদের দেখিনি বলে। দু-একটা থাকত mumford গঞ্জে, আর দু-একটা সঙ্গমের কাছে যে বিরাট parade ground, সেখানে। একবার এক conference এ এসেছেন কিছু বিদেশী বিজ্ঞানী। তার মধ্যে আছেন Stefan Vajda. একদিন উনি শহরে যাবেন ডলার থেকে টাকা করতে। আমি নানা ভাবে নিরস্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু উনি যাবেন-ই। শেষে, যাতে ওনাকে একা যেতে না হয়, পাঠিয়ে দিলাম আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে, তার গাড়িতে। ফিরে এলেন খানিক পরে। বিকেলের চায়ের বিশ্রাম চলছে, Stefan সাংঘাতিক উত্তেজিত। বলছেন, `গাড়ি করে যাচ্ছি, হঠাত দেখি সামনে একটা জঙ্গল। আমি ভাবছি রাস্তার মধ্যে জঙ্গল কোথা থেকে এলো? খানিক পরে বুঝলাম ওগুলো আসলে পাতা-সমেত গাছের ডালপালা, চলেছে একটা হাতির পিঠে। শেষে হাতিটাকেও দেখতে পেলাম।' সঙ্গে ছিলেন Lai Sheng Wang. তিনিও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন: `তুমি হাতি দেখেছ? তুমি সত্যি সত্যি একটা হাতি দেখেছ?' এঁরা দুজনেই থাকেন আমেরিকায়। সেখানে আর হাতি দেখার সুযোগ কোথায়?
কিন্তু সেই হাতিদের তো আর দেখি না। Mumford গঞ্জে এখন ঝাঁ-চকচকে রাস্তা হয়েছে। পাশে bike track. সেখানে হাতিদের চলার রাস্তা তো নেই। Smart City হবে নাকি ইলাহাবাদ! শহর যে কি করে smart হয় এই রহস্য আমি আজ-ও সমাধান করতে পারিনি। ওই হাতিরা আর ওদের মাহুতরা কি তবে ইলাহাবাদ ছেড়ে চলে গেল? হারিয়ে গেল ইলাহাবাদের জীবন থেকে? শুনেছি পশ্চিমের দেশে শহরের ছেলে-মেয়েরা নাকি জানে না গরু-মোষ-শুয়োর-মুরগি, যাদের দুধ-মাংস তারা খায়, কেমন দেখতে। আমাদের ছেলে-মেয়েরাও হয়ত বেড়ে উঠবে এই জেনে যে সব-ই দোকানে, বা আজকের দিনে supermaket এ, কিনতে পাওয়া যায়।
ফিরে যাই ছোটবেলার কথায়। সত্তরের দশক। রাজনীতির উথাল-পাথাল চলছে প. বাংলায়, সারা দেশে। মনে আছে বিরাট রেল ধর্মঘটের কথা ১৯৭৪-এ। আমাদের বাড়ির একতলার ছাদে দাঁড়ালেই তখন দেখা যেত সারাদিন অসংখ্য ট্রেন-এর আনা-গোনা। ধর্মঘটের সময় ট্রেন চলাচল প্রায় বন্ধ। ২০ দিন চলেছিল সেই ধর্মঘট। '৭৪ পেরিয়ে '৭৫। ১ মে সকালে উঠে দেখি জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিণের পাঁচিল লাগোয়া মাঠ আর কলাবাগানের চেহারা গেছে বদলে। কলা গাছ বোধহয় কাটা হয়েছিল আগেই। পড়েছিল মাঠ। কিন্তু সেই মাঠ-ই বা কোথায়? ছাদ থেকে চোখে পড়ল অসংখ্য তাঁবু। উদ্বাস্তু মানুষেরা জমি-টা `জবর-দখল' করে নিয়েছে। তখন `জবর-দখল' শব্দটার ঠিক মানে বুঝতাম না, ধীরে ধীরে বুঝেছি। তৈরী হয়ে গেল এক নতুন বসতি।
ওখানে দেখেছি কিছু মানুষকে তাঁত বুনতে। ওরা বোধহয় ঢাকা থেকে এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে। একবার আমার মামা-মামী, মামাতো দিদি সব এসেছেন আমাদের বাড়িতে। এঁরা নেহাত-ই কলকাতার শহুরে মানুষ। ফিরে যাচ্ছেন। দেখা গেল রাস্তার পাশে চালা ঘরে কেউ কেউ তাঁত বুনছেন। দাঁড়িয়ে পড়লেন ওরা। অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ দেখলেন। সেই তাঁত-বোনা মানুষগুলো-ও হারিয়ে গেল। মানুষগুলো হারিয়ে না গেলেও তাদের জীবন-যাত্রা হারিয়ে গেল। কোথায় তাঁত? কোথায় সেই ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষগুলোর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও সহজ-সরল জীবন? এখন তো আমরা সবাই এক অদ্ভুত আধা-শহুরে কৃত্রিমতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
এই যে হারিয়ে যাওয়া, জগন্নাথ-দের, ওই আদিবাসী মহিলাদের, মাহুতদের, এটা কি শুধু ওদের হারিয়ে যাওয়া? না কি একটা সময়, একটা জীবন, একটা পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া? technology র যুগে শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন থেকে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর হারিয়ে যাওয়া? কথাটা শুরু করেছিলাম আমার ছোটবেলার মফস্বল শহর/গঞ্জ দিয়ে। সেখানে তখন আমাদের জীবনে এই মানুষগুলোর জায়গা ছিল। এক আসনে না হলেও এদের জায়গা ছিল, অস্তিত্ত্ব ছিল। আজ এরা আমাদের জীবন থেকে মুছে গেছে। এরা কার্যতঃ অপরিচিত আমাদের কাছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। এই অপরিচিতির বেড়াটা আমাদের দেখতে দেয় না ওদের ব্যথা, বুঝতে দেয় না ওদের আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতির ওপর এই মানুষগুলোর নির্ভরতা আমাদের কাছে `উন্নয়নের' পথে অহেতুক বাধা বলে মনে হয়। এর মূল্য আমাদের দিতে হবে একদিন অনেক দামে। সে কথা অন্য কোনো সময়। আজ শুধু জগন্নাথ-দের সরল, অনাড়ম্বর জীবনের কথা-ই মনে করলাম।
No comments:
Post a Comment