Thursday, January 28, 2016

হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা ৩

জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিনের পাঁচিল পেরোলেই কলা গাছের বাগান, মাঠ আর পুকুর। কখনো কখনো মাহুতকে পিঠে নিয়ে হাতি এসে পড়ত আমাদের পাড়ায়।  ছোটদের মধ্যে হই-চৈ পড়ে যেত, `হাতি এসেছে, হাতি এসেছে।' দৌড় দিতাম রাস্তার দিকে।  রাস্তা চলতে চলতে হাতিরা দু-একটা কলা গাছ উপড়ে নিত বাগান থেকে, যেটুকু ওদের শুঁড়ের নাগালের মধ্যে আসে তার থেকে। সেই হাতির, হাতির মাহুতরা আসে না আজ আর।  আর আসবে কোথায়? আজ সেই বাগান নেই, মাঠ নেই, কলা গাছ-ও নেই।  আজকে আমাদের রাস্তায় ঝাঁ চকচকে গাড়ি চলে, মোটর বাইক চলে।  হাতি আর মাহুতদের সেখানে ঠাঁই নেই। 

হাতির কথা যখন হচ্ছে, তখন আমার বর্তমান বাসস্থান ইলাহাবাদ নিয়েও দু-চার কথা বলা যাক।  এখানেও কয়েকটা হাতি ছিল।  ছিল বলছি, অনেক দিন ওদের দেখিনি বলে।  দু-একটা থাকত mumford গঞ্জে, আর দু-একটা সঙ্গমের কাছে যে বিরাট parade ground, সেখানে।  একবার এক conference এ এসেছেন কিছু বিদেশী বিজ্ঞানী।  তার মধ্যে আছেন Stefan Vajda. একদিন উনি শহরে যাবেন ডলার থেকে টাকা করতে।  আমি নানা ভাবে নিরস্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু উনি যাবেন-ই।  শেষে, যাতে ওনাকে একা যেতে না হয়, পাঠিয়ে দিলাম আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে, তার গাড়িতে।  ফিরে এলেন খানিক পরে।  বিকেলের চায়ের বিশ্রাম চলছে, Stefan সাংঘাতিক উত্তেজিত।  বলছেন, `গাড়ি করে যাচ্ছি, হঠাত দেখি সামনে একটা জঙ্গল।  আমি ভাবছি রাস্তার মধ্যে জঙ্গল কোথা থেকে এলো? খানিক পরে বুঝলাম ওগুলো আসলে পাতা-সমেত গাছের ডালপালা, চলেছে একটা হাতির পিঠে।  শেষে হাতিটাকেও দেখতে পেলাম।' সঙ্গে ছিলেন Lai Sheng Wang. তিনিও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন: `তুমি হাতি দেখেছ? তুমি সত্যি সত্যি একটা হাতি দেখেছ?' এঁরা দুজনেই থাকেন আমেরিকায়।  সেখানে আর হাতি দেখার সুযোগ কোথায়?

কিন্তু সেই হাতিদের তো আর দেখি না।  Mumford গঞ্জে এখন ঝাঁ-চকচকে রাস্তা হয়েছে। পাশে bike track. সেখানে হাতিদের চলার রাস্তা তো নেই। Smart City হবে নাকি ইলাহাবাদ! শহর যে কি করে smart হয় এই রহস্য আমি আজ-ও সমাধান করতে পারিনি।  ওই হাতিরা আর ওদের মাহুতরা কি তবে  ইলাহাবাদ ছেড়ে চলে গেল? হারিয়ে গেল ইলাহাবাদের জীবন থেকে? শুনেছি পশ্চিমের দেশে শহরের ছেলে-মেয়েরা নাকি জানে না গরু-মোষ-শুয়োর-মুরগি, যাদের দুধ-মাংস তারা খায়, কেমন দেখতে।  আমাদের  ছেলে-মেয়েরাও হয়ত বেড়ে উঠবে এই জেনে যে সব-ই দোকানে, বা আজকের দিনে supermaket এ, কিনতে পাওয়া যায়। 

ফিরে যাই ছোটবেলার কথায়।  সত্তরের দশক।  রাজনীতির উথাল-পাথাল চলছে প. বাংলায়, সারা দেশে।  মনে আছে বিরাট রেল ধর্মঘটের কথা ১৯৭৪-এ।  আমাদের বাড়ির একতলার ছাদে দাঁড়ালেই তখন দেখা যেত সারাদিন অসংখ্য ট্রেন-এর আনা-গোনা।  ধর্মঘটের সময় ট্রেন চলাচল প্রায় বন্ধ।  ২০ দিন চলেছিল সেই ধর্মঘট।  '৭৪ পেরিয়ে '৭৫।  ১ মে সকালে উঠে দেখি জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিণের পাঁচিল লাগোয়া মাঠ আর কলাবাগানের চেহারা গেছে বদলে।  কলা গাছ বোধহয় কাটা হয়েছিল আগেই।  পড়েছিল মাঠ।  কিন্তু সেই মাঠ-ই বা কোথায়? ছাদ থেকে চোখে পড়ল অসংখ্য তাঁবু।  উদ্বাস্তু মানুষেরা জমি-টা `জবর-দখল' করে নিয়েছে।  তখন `জবর-দখল' শব্দটার ঠিক মানে বুঝতাম না, ধীরে ধীরে বুঝেছি।  তৈরী হয়ে গেল এক নতুন বসতি।  

ওখানে দেখেছি কিছু মানুষকে তাঁত বুনতে। ওরা বোধহয় ঢাকা থেকে এসেছিলেন উদ্বাস্তু হয়ে। একবার আমার মামা-মামী, মামাতো দিদি সব এসেছেন আমাদের বাড়িতে।  এঁরা নেহাত-ই কলকাতার শহুরে মানুষ।  ফিরে যাচ্ছেন।  দেখা গেল রাস্তার পাশে চালা ঘরে কেউ কেউ তাঁত বুনছেন।  দাঁড়িয়ে পড়লেন ওরা।  অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ দেখলেন।  সেই তাঁত-বোনা মানুষগুলো-ও হারিয়ে গেল। মানুষগুলো হারিয়ে না গেলেও তাদের জীবন-যাত্রা হারিয়ে গেল।  কোথায় তাঁত? কোথায় সেই ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষগুলোর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও সহজ-সরল জীবন? এখন তো আমরা সবাই এক অদ্ভুত আধা-শহুরে কৃত্রিমতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।

এই যে হারিয়ে যাওয়া, জগন্নাথ-দের, ওই আদিবাসী মহিলাদের, মাহুতদের, এটা কি শুধু ওদের হারিয়ে যাওয়া? না কি একটা সময়, একটা জীবন, একটা পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া? technology র যুগে শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন থেকে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর হারিয়ে যাওয়া? কথাটা শুরু করেছিলাম আমার ছোটবেলার মফস্বল শহর/গঞ্জ দিয়ে। সেখানে তখন আমাদের জীবনে এই মানুষগুলোর জায়গা ছিল।  এক আসনে না হলেও এদের জায়গা ছিল, অস্তিত্ত্ব ছিল।  আজ এরা আমাদের জীবন থেকে মুছে গেছে।  এরা কার্যতঃ অপরিচিত আমাদের কাছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।  এই অপরিচিতির বেড়াটা আমাদের দেখতে দেয় না ওদের ব্যথা,  বুঝতে দেয় না ওদের আকাঙ্ক্ষা। প্রকৃতির ওপর এই মানুষগুলোর নির্ভরতা আমাদের কাছে `উন্নয়নের' পথে অহেতুক বাধা বলে মনে হয়।  এর মূল্য আমাদের দিতে হবে একদিন অনেক দামে।  সে কথা অন্য কোনো সময়।  আজ শুধু জগন্নাথ-দের সরল, অনাড়ম্বর জীবনের কথা-ই মনে করলাম।  

Saturday, January 16, 2016

হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা ২

আরো কিছু মানুষের কথা মনে পড়ছে যারা হারিয়ে গেছে।  হারিয়ে গেছে শুধু আমাদের মফস্বল শহর থেকে নয়, হারিয়ে গেছে মধ্য-বিত্ত বাঙালির সমষ্টিগত চেতনা থেকে। হারিয়ে গেছে তার রোজকার জীবন থেকে।  হারিয়ে গেছে তার গান, গল্প, নাটক, সিনেমা থেকে।  

এক বৃদ্ধা মহিলা ছিলেন।  কাজে আসতেন আমাদের বাড়িতে।  কি কাজে আসতেন মনে পড়ে না।  বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করা -- এসব নয়।  হয়ত আসতেন কয়লা ভাঙ্গতে, বা ওই জাতীয় কোনো কাজে।  তখন আমাদের এলাকায় LPG র ব্যবহার বলতে গেলে চালু হয় নি।  সবার ঘরেই কয়লার উনোন জ্বালিয়ে রান্না হত।  আমাদের প্রজন্মের যারা, তাদের নিশ্চই মনে আছে, পাড়ার কয়লার গোলা থেকে লোক এসে বস্তা থেকে কয়লা ঢেলে দিয়ে যেত।  কয়লার টুকরোগুলো হত বড় বড়।  উনোনে ব্যবহারের যোগ্য নয়।  সেগুলোকে ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরো করতে হত।  সে ছিল বেশ পরিশ্রমের কাজ।  বোধহয় সেই কাজেই আসতেন মহিলা।  বৃদ্ধা।  গায়ের চামড়ায় বয়সের রেখা।  কিন্তু শরীরে অসীম ক্ষমতা।  উনিও ছিলেন কোনো tribal. কি জানি না।  একবার অনেক দিন আসছেন না।  মা বললেন গিয়ে দেখে আসতে হবে কেন আসছে না।  শরীর খারাপ হলো কি না।  আর কাজে আসবে কিনা।  

আমিও চললাম মায়ের সাথে একদিন।  বেশি দূর নয়।  আমাদের বাড়ি থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ।  মা জানতেন কোথায় উনি থাকতেন।  তখন আমাদের ওই এলাকায় বাড়ি-ঘর হাতে গোনা।  ওই দশ মিনিটের পথে যে-কটা বাড়ি চোখে পড়ত তার প্রত্যেকটার বাসিন্দারাই আমাদের জানা।  একেবারে ব্যক্তিগত আলাপ না থাকলেও কোন বাড়িতে কে থাকে, এবং কি করে, এলাকার সকলেই প্রায় জানত।  খানিক দূর গিয়ে রাস্তার ওপরের বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে যে গালিটা গেছে সেটা দিয়ে একটু ঢুকে গেলেই বিরাট খোলা মাঠ।  তখন আমাদের এলাকায় এরকম মাঠ-পুকুর অসংখ্য।  পুকুর চুরি তখন শুরু হয় নি।  

এরকম একটা গলি দিয়ে ঢুকে মাঠের মধ্যে গিয়েই দেখি এক কোণে একটা ঘর।  মাটি থেকে একটু উঁচুতে বানানো একটা বাঁশের মাচা।  সেটাকে ঘিরে পাতায় ঘেরা, পাতায় ঢাকা, বোধহয় খেজুরের-ই পাতা হবে, অনেক খেজুর গাছ এদিক-ওদিক সে সময়ে, একটা ঘর।  একটা মানুষ তার মধ্যে শুতে-বসতে পারে কোনো রকমে, এরকম মাপের একটা ঘর।  মা আমাকে নিয়ে গেলেন সেটার কাছে।  দেখি তার মধ্যে শুয়ে বিড়ি খাচ্ছেন সেই মহিলা।  বলা বাহুল্য, আমাদের মতো মধ্য-বিত্ত বাঙালি ঘরের মহিলাদের মধ্যে ধূমপান আজকের মতো সে সময়েও প্রায় বিরল ছিল।  ছিল না বলাই ভালো।  কিন্তু আমরা ওই ধরণের মহিলাদের ধূমপান করতে দেখেছি, দেখতাম প্রায়শই।  আমরা জানতাম এরা হুবহু আমাদের মতো নয়।  কোথায় যেন একটু আলাদা।  কিন্তু এরা অপরিচিত ছিলেন না আমাদের কাছে।  একটু বিভেদ, একটু তফাত সত্ত্বেও এরা আমাদের রোজকার জীবনে উপস্থিত ছিলেন কোনো না কোনো ভাবে।  তাই ওনার বিড়ি খাওয়া আমাকে একটুও অবাক করে নি।  যেটা একটু ধাক্কা দিয়েছিল সেটা হলো এই যে উনি ঐটুকু মাত্র একটা পাতার ঘরের মধ্যে থাকেন। সে সময়ে আমাদের যে খুব আড়ম্বরের জীবন ছিল তা আদৌ নয়।  কিন্তু, তবু, কি করে যে একটা মানুষ ঐটুকু একটা ঘরের মধ্যে, একা, থাকে এটা আমাকে খুব একটু ঘা দিয়েছিল।  


যতদূর মনে পড়ে, উনি বলেছিলেন, খুব শরীর খারাপ।  পেটে পাথর হয়েছে। খুব সাধারণ দু-একটা কথা বার্তা বলে আমরা চলে এসেছিলাম। তারপর আর সেই মহিলা কখনো আমাদের বাড়িতে কাজে এসেছিলেন বলে মনে পড়ে না।  মারা গেছিলেন? অন্য কোথাও চলে গেছিলেন? জানি না কিছুই।  উনিও, ওনার মতো মানুষরাও হারিয়ে গেলেন আমাদের মফস্বল শহরের জীবন থেকে। যে সব মাঠের কোণে বাঁশের মাচার চারপাশে খেজুর পাতার ঘর বানিয়ে এরা থাকতেন সেই মাঠগুলো-ও চুরি হয়ে গেল আমাদের এলাকা থেকে, আমাদের জীবন থেকে। প্রান্তিক, মাটি থেকে উঠে আসা এই মানুষগুলো আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল কবে যেন।  হারিয়ে গেল আমাদের সমাজ থেকে, আমাদের সমষ্টিগত চেতনা থেকে। এখন এরা কোথায় থাকে? শহরের বস্তিগুলোতে? নাকি এরা ফিরে গেছে জঙ্গলের কাছে? এরা কি আর আগের মতো নিজেদের পরিচয় নিয়ে থাকতে পারে? নাকি সারা পৃথিবীর মতো এরাও `শহুরে’ হয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে?

Sunday, January 10, 2016

হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা ১

আজকে যখন পুকুর-মাঠ ভরিয়ে ঝাঁ-চকচকে বাড়ি, ফ্ল্যাট, অথবা পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে ফ্ল্যাট বানানো `প্রগতি'র সমার্থক হয়ে গেছে আমাদের ছোট মফস্বল শহরে, তখন ভীষণ করে ফেলে আসা সময়, আর কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা মনে পড়ছে।  মনে পড়ছে তখনকার কথা যখন আমার বয়স তিন-চার-পাঁচ বছর।  আমাদের পাড়া বলতে বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর চাষের জমির মধ্যে গোটা পাঁচ-সাত বাড়ি।  এর মধ্যে দুটো বাড়ি আমাদের বাবা-জ্যাঠাদের।  জ্যেঠার বাড়ির দক্ষিণের দেওয়াল টপকালেই বিস্তীর্ণ কলা-বাগান, আর পুকুর।  জ্যেঠার বাড়িতে ঢোকার দরজাও ছিল দক্ষিণ মুখো, মাটি থেকে একটু উঁচুতে।  গোটা তিনেক সিঁড়ি চড়ে উঠতে হত।  সব থেকে ওপরের সিঁড়িতে দাঁড়ালে আমরা ছোটরাও দেখতে পেতাম হাওড়া-বর্ধমান লাইন-এ ট্রেন-এর আনা-গোনা।  বাড়ির দক্ষিণ-মুখো সদর দরজা আর দক্ষিণের পাঁচিলের মাঝখানে ছিল মস্ত  কুঁয়ো, সেই কুঁয়ো যার মধ্যে আমার মেজ দাদা পড়ে গেছিলেন খুব ছোটবেলায়, এবং তারপরেও দাদার এবং আমার জ্যেঠিমার (আমাদের সকালের মণি) অকল্পনীয় সাহসে বেরিয়ে এসেছিলেন সেখান থেকে। সে আরেক দিনের গল্প। আজকের গল্প তাদের নিয়ে যারা আমার জ্যেঠার জমির দক্ষিণ-পূব কোণটাতে থাকত পাতায় ছাওয়া এক টিনে ঘেরা চালায়।  আজ ঠিক সেই জায়গায় আমার বড়দার বিরাট দুতলা বাড়ি।  সেদিন সেখানে দাঁড়ালে পূবে চোখে পড়ত আমাদের রাস্তা `সতীশ চক্রবর্তী লেন' পেরিয়ে আরেক বিস্তীর্ণ বাগান এবং চাষের জমি।  সত্তরের দশকে ওসব জায়গায় নাকি নিত্য-ই রাজনৈতিক খুন-খারাবি লেগে থাকত।  ছিল শেয়াল, আর যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য ভূতের উপদ্রব। দক্ষিণে সেই কলা-বাগান আর পুকুর।  উত্তর আর পশ্চিমে আমাদের এবং আর দু-চারটে বাড়ি।  

ওই টিন ঘেরা চালায় থাকত জগন্নাথ আর তার বউ।  মহিলার পরিচয়-ই ছিল `জগন্নাথের বউ' বলে।  তবে আমার মা-বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন `জগন্নাথের বউ' না বলে ওকে শুধু `বউ' বলে ডাকতে।  কেন জানি না।  একটু বড় হলে শুনেছি জগন্নাথের বউ নাকি আসলে ওর ভাইয়ের বউ।  তা এ ঘটনা আমাদের সমাজে খুব অবাক করার মতো কিছু নয়।  জগন্নাথ-রা অবশ্য ছিল সাঁত্ততাল। কালো কুচকুচে কিন্তু উজ্ব্বল গায়ের রং।  যেন ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে খোদাই করে তৈরী নিখুঁত শরীর। যদিও জগন্নাথের বা ওর বৌয়ের বয়স খুব কম ছিলো না, যতটুকু মনে পড়ে।  জগন্নাথ আর ওর বউ আমাদের রোজকার জীবনের অংশীদার ছিল। আমরা নিশ্চিন্তে খেলতাম জগন্নাথের ঘরের সামনে।  ওদের ঘরের ভেতরেও যেতাম বিনা দ্বিধায়।  আমাদের যাবতীয় টুক-টাক কাজে জগন্নাথ আর ওর বউ আমাদের সব সময় সাহায্য করত।  কখন, কি ভাবে জগন্নাথ আর ওর বউ আমার জ্যেঠার বাড়ির এক কোণে যে ঠাঁই নিয়েছিল সে কথা আর আমার কোনদিন জানা হয় নি।  আসলে ওই বয়সে এই প্রশ্ন-টা কোনদিন আমাদের মনে উঁকি-ই দেয় নি। জগন্নাথ আর ওর বউ ছিল আমাদের জীবনের-ই অঙ্গ।  আমাদের থেকে একটু আলাদা, গায়ের রঙ্গে, আদব কায়দায়, বোদহয় খাদ্যাভ্যাসেও, ব্যাস এই পর্যন্ত।  শুনেছি ওরা নাকি সাপ, ইঁদুর এসব খেত। সাপ খেতে কখনো দেখিনি।  তবে একবার, খুব ছোটবেলায়, জগন্নাথকে একটা বড় ধেরে ইঁদুর মেরে নিয়ে যেতে দেখেছিলাম।  ওরা কি ওটা খেয়েছিল?  সাঁত্ততালরা কি ইঁদুর খায়? আমার জানা নেই।  কিন্তু ওই যে বললাম, এগুলো আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক ছিল না।  আমাদের থেকে একটু আলাদা হওয়া সত্বেও জগন্নাথ-রা আমাদের জীবনের-ই অঙ্গ ছিল।  

মনে আছে আরো ছোটবেলার কথা।  আমাদের নিজেদের বাড়ি তখন তৈরী হয় নি।  আমরা জ্যেঠার বাড়ির কাছেই একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম।  সেখান থেকে উঠে যাচ্ছি আরেকটা ভাড়া বাড়িতে।  জিনিস-পত্র নিয়ে যাওয়া একটা বড় কাজ।  ডাক পড়ল জগন্নাথ আর জগন্নাথের বৌয়ের।  মা ঝুড়ি ভরে ভরে জিনিস দিচ্ছেন, আর ওরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, যা কিনা মিনিট দশেকের হাঁটা পথ, নিয়ে যাচ্ছে মাথায় করে।  একবার জগন্নাথের বউ এসেছে| আমাদের ঘরে দু ঝুড়ি জিনিস সাজানো।  তার একটা জগন্নাথের বউ মাথা তুলেছে।  মা বারণ করছেন আরেকটা নিও না, আর বউ জোরাজুরি করছে, আরেকটা দাও না, আমি ঠিক হাতে নিয়ে নেব। দ্বিতীয়টা নেওয়ার সময় যা হবার, মাথার ঝুড়িটা পড়ে গেল, আর তার মধ্যে রাখা মায়ের সাধের কৃষ্ণনগরের কিছু মাটির পুতুল ভেঙ্গে খান-খান।  মাকে দীর্ঘ দিন এই নিয়ে আক্ষেপ করতে শুনেছি।  কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো তিক্ততা ছিল না জগন্নাথ বা ওর বউ সম্বন্ধে।  ওরা আগের মতই আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়েই রইলো।  তখন আমাদের জীবনে অনুসঙ্গের চেয়ে মানুষ এবং তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কগুলো অনেক বেশি প্রাথমিক ছিল।  

জগন্নাথ আর ওর বৌয়ের যে শেষে কি হলো আমার আজ আর মনে নেই।  ওরা ওখানে মারা গেছিল বলে আমার মনে পড়ে না।  হয়ত তার আগেই ওরা অন্য জায়গায় চলে গেছিল।  হয়ত যে সময় থেকে আমাদের পাড়াটা সরল গ্রামীনতা কাটিয়ে কুত্সিত আধা-শহুরে `প্রগতি'র হাত ধরেছিল, সে সময়েই ওরা বুঝে গেছিল ওদের ওখানে থাকার দিন শেষ।  নিজেদের এলাকা ছেড়ে এসেও যে সহজ, স্বাভাবিক, সরল জীবন ওরা বাঁচতে পেরেছিল তা আর সম্ভব হবে না।  তাই একদিন ওরা হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে।  আজকে আমাদের ছোট মফস্বল শহরের ফ্ল্যাট-সংস্কৃতিতে জগন্নাথদের জন্য কোনো কোণ আর পড়ে নেই।