Saturday, October 17, 2015

১৯৭১-৭২


ছবি থেকে যায়. কিছু ছবি খুব গভীরভাবে থেকে যায়, মনে. অনেক দূরের ছবি, সময়ের দূরত্ব। যেন দূরবীন দিয়ে দেখা. মাঝখানটা স্পষ্ট, পাশটা তত নয়. সালটা ১৯৭১ বা ৭২. ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে, কিন্তু ঘাঁটব না. আজ শুধু স্মৃতি ঘাঁটব। 

নারকেলের মালা দিয়ে বানানো দাঁড়িপাল্লা. দু-পাশে দুটো, সুতো দিয়ে ঝুলছে একটা কাঠির দু প্রান্ত থেকে. কাঠির মাঝে আরেকটা ছোট সুতো, ধরে থাকার জন্য. যেমন দোকানিরা করে. একটাতে মাটি, অন্যটাতে কি ছিল আজ আর মনে নেই. আমরা ছোটরা এই নিয়ে খেলছি বাগানে. মা, বাবা, দুই জ্যাঠামশাই ও জ্যেঠিমা বললেন, তোমরা এখানেই খেলা কর, আমরা ভোট দিয়ে আসছি. আমরা বিশেষ হেলে-দুলে বসেছিলাম বলে মনে পড়ে না. বরঞ্চ খুশি হয়েছিলাম কিছুক্ষণ আমাদের তদারকি করার কেউ থাকছে না বলে.

খেলা চলছে. দাঁড়িপাল্লা balance করার প্রচেষ্টা চলছে. কিন্তু সে সময়ে সমাজের, রাজনীতির balance ছিল না বিশেষ. ওই বয়সে সময়ের অঙ্কের হিসাব থাকে না. সকাল, দুপুর, বিকেল-সন্ধ্যা আর রাতের হিসাব থাকত শুধু. সে সময়ে বোধহয় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে. কিছু পরে ফিরে এলেন সকলে. ভোট দেওয়া যায় নি. ভোট পড়ে গেছিল ওঁদের নামে ততক্ষণে. গেল না, কেন গেল না এই প্রশ্ন আমাদের মনে দাগ কাটেনি ওই বয়সে, স্বাভাবিকভাবেই. কিন্তু ছবিটা, ওঁদের রাগ এবং দুঃখটা, সেই অসক্ত ক্রোধের ছবিটা থেকে গেছিল মনে, গভীরে কোথাও। 


প. বাংলার সাম্প্রতিক পুরভোট, ঘটনাবলী, সন্ত্রাস, সাধারণ মানুষের ভোট দিতে না পারা, মনে পড়িয়ে দিল অনেক দূরের সেই দিনটার স্মৃতি. মানুষের অগ্রগতি কি তবে বৃত্তাকার? 

Sunday, October 4, 2015

সূর্য্য মামা

আজ খুব করে সূর্য্য মামার কথা মনে পড়ছে. নাম-টা মজার, আমরা তো মজা করে সুয্যি-মামা বলতাম মাঝে মাঝে, বিশেষ করে বড়রা সামনে না থাকলে. আমার জেঠিমার ভাই. মাঝে মাঝেই দেখা হত জ্যেঠার বাড়িতে. গল্প বলিয়ে ছিলেন খুব. এত চমত্কার করে বলতেন পুরনো দিনের সব কথা. দেশভাগের আগের কথা, দেশভাগের পরের কথা. দেশভাগের পরে, তখন-ও মামারা সকলে এপারে চলে আসেননি, সেই সময়কার কথা. মনে আছে একদিন বলছিলেন. সেদিন জ্যেঠার বাড়িতে কিছু একটা অনুষ্ঠান ছিল. বোধহয় দিদির বিয়ে, বৌভাতে কনে-যাত্রী যাওয়ার কথা সকলের. মহিলারা তখন সাজে ব্যস্ত. মামা তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার সাথে গল্প করছেন. বলছেন ৭০-৭১-এর দিনগুলোর কথা যখন শেষ-মেশ চলে আসতে বাধ্য হন এপারে. কথা বলতে বলতে মামা হারিয়ে গেলেন স্মৃতির গহীনে। বলছিলেন সেই সন্ধ্যার কথা যখন ওঁদের আসে-পাশের কিছু বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় দাঙ্গাবাজ-রা. বলছিলেন কেমন করে উত্কন্ঠায় বিনিদ্র কাটিয়েছেন সেরকম কিছু রাত, বলছিলেন কেমন করে রাজনীতির চক্রে হঠাত করে অচেনা হয়ে যায় অনেক দিনের চেনা মানুষ। বলছিলেন আর বলার মধ্যে দিয়ে আমার সামনে মূর্ত করে তুলছিলেন সেই সময়, সেই দিনগুলোকে.

বলছিলেন, বলার মধ্যে অনেক দুঃখ ছিল, অভিমান ছিল, কিন্তু রাগ ছিল না, ছিল না কোনো বদলার ভাবনা. আমার বাবা-জ্যেঠার মধ্যেও দেখেছি এই মানসিকতা. দেশের কথা, ছেলেবেলার গ্রামের কথা, বড় হয়ে ওঠার কথা, ছেড়ে আসার দুঃখ, কত যে শুনেছি! কখনো পাইনি কোনো অসূয়ার ছোঁয়া ওদের গলায়. নিজেদের জীবনের অনেক দুঃখভোগের মধ্যেও স্পষ্ট একটা সহানুভূতির আবেগ থেকে গেছিল সেই সব অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষগুলোর জন্য, যারা অনেক দিন সুখ-দুঃখের বারমাস্যার সাথী ছিল. তারপর এক অসাধু রাজনীতির চালে, যেন অসহায়, অপারগ হয়েই, অচেনা শত্রুর মতো দেখা দেয় এক দিন হঠাত।


আমার বাবা-জ্যাঠাকে খোয়াতে হয়েছিল অনেক কিছুই. এক দিন যে মানুষগুলোর মুখ থেকে আওয়াজ বেরোলে দশ জন পরিচারক ছুটে আসত, সেই মানুষগুলোকে নিরাশ্রয় কাটাতে হয়েছে। একবেলা খেলে অন্য বেলা খাওয়া জুটবে কি না ভরসা ছিল না. আশ্চর্য্য হই, এত কিছু হারানো মানুষগুলোর মধ্যে ক্ষমা করার এমন অসীম উদারতা আসে কোথা থেকে? নাকি সব হারিয়েছেন বলেই ওঁদের ক্ষমা করার মনটা অটুট ছিল? আরো আশ্চর্য্য হই তাদের দেখে যারা গায়ে একটি আঁচড় না লাগা সত্ত্বেও এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের দেশের যাবতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি এক অমানবিক ঘৃণা পোষণ করেন. তাদের বলি, কখনো আসবেন আমার কাছে, আমার বাবা-জ্যাঠা-সুয্যি মামার গল্প বলব আপনাকে। হয়ত বা আপনি মানসিক শান্তি পাবেন.